যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি

মুঈদ ইউসুফ,
শেয়ার করুন

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাকিস্তান নীতি কি হবে বা দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলকে তিনি কিভাবে সামলাবেন তা নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহের অন্ত নেই। আবার, সত্যিকারের অর্থবহ কিছু আসলেই পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক সন্দেহ, অনিশ্চয়তা। সবচেয়ে ভালো হবে অনিশ্চয়তার গ্রন্থিগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়া নীতি’র নবরূপায়নের ক্ষেত্রে সত্যিকারের কোন পরিবর্তন ঘটাতে পারে এমন বিষয়গুলোর ওপরও নজর দিতে হবে।

সবচেয়ে অজানা যে বিষয় তাহলো পলিসি ইস্যুগুলোতে ট্রাম্পে’র দৃষ্টিভঙ্গী কেমন হবে সেটি। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, বিশ্বের যেখানেই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে যারা অধিষ্ঠিত হয়েছেন তারা অবস্থানগত কারণে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন, নিজেদেরকে পরিবর্তন করেছেন। দায়িত্বের প্রতি বিভিন্ন মানুষ বিভিন্নভাবে সাড়া দেয়। কিন্তু এর মধ্যে কমজনই পারেন তিনি যেভাবে চান সেই পথে হাঁটতে। তবে, যে মানুষটির কোন সরকারি দফতর সামাল দেয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই তাকে নিয়ে অনিশ্চয়তাটি অনেক বড় হতে বাধ্য।
গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো কিভাবে সামাল দিতে হবে তার আগাম ইংগিত পাওয়া যেতে পারে নীতি ব্যবস্থাপনার ধরন থেকে। কিন্তু এ ব্যাপারেও আমাদের যথেষ্ট ধারণা নেই। ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজ-এর সঙ্গে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন, সিআইএ, ইউএসএআইডি’র মতো সংস্থাগুলোর মিথষ্ক্রিয়া কেমন হবে সে ব্যাপারে কেউ নিশ্চিত নয়। প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ কি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতির ইস্যুগুলোতে অধিকতর সক্রিয় কোন পন্থা [হ্যান্ডস-অন এ্যাপ্রোচ] অবলম্বন করবে? যদি তাই হয়, তবে অন্য সংস্থাগুলো গৌণ হয়ে পড়বে। অথবা, ভাইস প্রেসিডেন্টের দফতরের ক্ষমতা কি বাড়ানো হবে? অনেকের মনে এ ধারণা বিরাজ করছে এবং তা হবে মোটামুটি অভিনব। কিন্তু, এতে কারো পক্ষে ভবিষ্যদ্বাণী করা আরো বেশি কঠিন হয়ে যাবে।
এরপর মন্ত্রিসভায় যাদেরকে নেয়া হবে তাদের সামনে দক্ষিণ এশিয়ার চেয়ে বিশ্বের অন্যান্য অংশে বেশি মনযোগ দেয়ার মতো অনেক বিষয় থাকবে। দক্ষিণ এশিয়ায় এমন বড় কোন ঘটনা, বিশেষ করে খারাপ কোন ঘটনা, যদি খবরের শিরোনাম না হয় তাহলে এ অঞ্চল অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকার সম্ভাবনা কম। দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্তরের অগ্রাধিকার পেলে সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গেই সম্পর্কটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হবে। তাই স্টেট ডিপার্টমেন্ট বা পেন্টাগনে তুলনামূলক নিচের সারিতে কাদেরকে নেয়া হচ্ছে তা আমাদেরকে জানতে হবে। তখনই বুঝা যাবে দেশটি পাকিস্তান ও এর প্রতিবেশি দেশগুলোর ব্যাপারে কি ভাবছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার দক্ষিণ এশিয়াকে কিভাবে সামাল দেবে এই প্রশ্নটির সঙ্গে অনেক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ৯/১১ ঘটনার পর পাকিস্তান ও ভারতকে আলাদা করে দেখতে শুরু করলেও পরে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে এক কাতারে নিয়ে আসে। হিলারি ক্লিনটনের আমলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের জন্য একজন বিশেষ দূত নিয়োগ এর প্রমাণ। তখন এই দুই দেশকে ভারতসহ সার্কের অন্যান্য দেশ এবং মধ্য এশিয়া থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া থেকে আলাদা চোখে দেখার এই মার্কিন নীতি পাকিস্তান কখনো ভালোভাবে নিতে পারেনি। পাকিস্তান পররাষ্ট্র দফতরের অনেকে মনে করেন পাকিস্তানকে দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার সঙ্গে এক কাতারে নিলেই যুক্তরাষ্ট্র ভালো করতো। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কাতারে ফেলা হলে পাকিস্তানের প্রতি মনযোগ কমে যেতো। কিন্তু এতে আফগানিস্তান বা ভারতের ক্ষেত্রে পাকিস্তান-মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গী এক রকম হতো সেই সম্ভাবনাও ছিলো কম। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পরিকল্পনার পরিবর্তন ঘটবে তারও কোন নিশ্চয়তা নেই।
ভারত-পকিস্তান ইস্যুতে পেন্টাগনের অবস্থান অনেক বেশি অনিশ্চিত। এই দুই দেশ ভিন্ন ভিন্ন সামরিক কমান্ডের আওতায় পড়েছে। এতে বুঝা যায়, দু’দেশের ব্যাপারে আলাদা মনোভাব গ্রহণ করা হবে। অন্যদিকে, পাক-আফগান যে এক কাতারেই পড়বে তা বুঝা যায় দুটি দেশই ‘সেন্টকম’-এর আওতায় থাকার কারণে। আফগানিস্তানে ন্যাটো বাহিনীর রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ওপর পেন্টাগনের নির্ভরতা বহু বছর ধরে ইসলামাবাদের হাতে ছিলো ‘ট্রাম্প কার্ড’র মতো । সেই নির্ভরতা এখন আর নেই। ফলে পাকিস্তানের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ততটা সহনীয় মনোভাব নাও গ্রহণ করা হতে পারে।
সম্ভবত কংগ্রেসই হলো কিছুটা ভবিষ্যদ্বাণী করার মতো জায়গা। পাকিস্তানের উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো অনেক কারণ রয়েছে সেখানে। আফগানিস্তানে মার্কিন স্বার্থের বিষয়টি এখানে প্রাধান্য পাচ্ছে। আফগানিস্তানের বিদ্রোহীদের আন্ত:সীমান্ত যাতায়াত বন্ধ করতে পাকিস্তান কিছু করছে না – এমন মনোভাবও বিরাজ করছে কংগ্রেসম্যানদের মনে। অনেক দিন থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণের হুমকি দেয়া হচ্ছে। এই হুমকি আগামীতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে। ভারতের হম্বিতম্বির বিপরীতে পাকিস্তানের ক্ষীণ স্বর পাহাড়ের গায়ে অনুরণনের মতো। এ অবস্থা পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
পরিশেষে, ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিংক-ট্যাংকগুলোর কাছে দক্ষিণ এশিয়া ক্রমাগতভাবে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে। তাদের মনযোগ চলে গেছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইসলামিক স্টেট-এর মতো গ্রুপগুলোর দিকে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের তৎপরতাও থিংক-ট্যাকগুলোর মনযোগ কাড়ছে। আর মনযোগ কমে যাওয়ার মানে হলো সরকারি পর্যায়ে নীতি নিয়ে বিতর্কের সম্ভাবনাও কমে যাওয়া। এর শেষ পরিণতি হতে পারে নিস্পৃহতা ও নীতিগত বৈকল্য। আবার এটা সম্পর্ক জোরদারে জন্য নীরব কূটনীতি পরিচালনার সুযোগও সৃষ্টি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তান এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।

[লেখক ওয়াশিংটনভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ, দি ডন থেকে অনুদিত]